০১:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

আওয়ামী লীগের জন্ম যেভাবে হয়েছিল

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাত দশকের বেশি সময় পার করেছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।

১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন বিকালে ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় নতুন একটি রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে সেই দলের নাম পরিবর্তন হয়ে হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

যেভাবে গঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরে ঢাকায় মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলানা আকরাম খান এবং খাজা নাজিমুদ্দিন।

সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী যে প্রোগ্রেসিভ [উদারপন্থী) নেতারা ছিলেন, তারা তখন সেখানে নিজেদের অবহেলিত মনে করছিলেন। তখন তারা মোঘলটুলিতে ১৫০ নম্বর বাড়িতে একটি কর্মী শিবির স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা চিন্তা করছিলেন। কলকাতা থেকে এসে শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সাথে যুক্ত হন।
তখন টাঙ্গাইলে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ পদত্যাগ করার কারণে শূন্য হওয়া একটি উপনির্বাচনে দুই দফায় মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হক। কিন্তু তাদের দুজনের নির্বাচনী ফলাফলই অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

তখন তারাও এসে এই মুসলিম কর্মীদের সঙ্গে মিলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা ভাবতে শুরু করেন। তারা একটি সভা ডাকেন। সেই সভা ডাকার প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান।

কিন্তু সেই সভা করার জন্য কোন অডিটোরিয়াম পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন কে এম দাস লেনের কাজী হুমায়ুন রশীদ তার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে সভা করার আহবান জানান।
সেখানেই ২৩শে জুন বিকালে আড়াইশো-তিনশো লোকের উপস্থিতিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী সেই দলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।

সেই সঙ্গে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’, যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

যারা ছিলেন নবগঠিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে

নতুন দল গঠনের পর মওলানা ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয় একটি নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করার জন্য। তিনি অন্যদের সাথে পরামর্শ করে একটি কমিটি ঘোষণা করেন।

সেই নতুন কমিটির সভাপতি হলে মওলানা ভাসানী। সহ-সভাপতি হলেন আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান, আহমেদ আলী খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আবদুস সালাম খান। সাধারণ সম্পাদক হলেন শামসুল হক।

ট্রেজারার হন ইয়ার মোহাম্মদ খান, যার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে প্রথম সভার আয়োজন হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে আটক থাকলেও তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এভাবেই প্রথম ৪০ জনের কমিটি গঠিত হয়। তবে পরবর্তীতে তাদের অনেকে আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকেননি।

দলের নামের পরিবর্তন
‘দলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি থাকায় পরবর্তীতে কেউ কেউ আপত্তি করছিলেন। এ নিয়ে দলে বেশ একটি বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যে মুসলিম শব্দটি থাকবে নাকি থাকবে না।”

তখন হিন্দু এবং মুসলিম আসনে আলাদাভাবে নির্বাচন হতো। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় একটা সমঝোতা হয়েছিল যে, এই দলটি একটি অসাম্প্রদায়িক দল হবে। ওই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায় যুক্তফ্রন্ট, যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খেলাফত পার্টি আর নেজামে ইসলামী পার্টির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিল ১৪৩টি আসন।

যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
যদিও মওলানা ভাসানী দলকে অসাম্প্রদায়িক করতে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য জোর দিচ্ছিলেন, কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চাইছিলেন যে মুসলিম শব্দটি থাকুন। কারণ তার ভয় ছিল, এটা বাদ হলে পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা কমে যাবে,”

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ আওয়ামী মুসলিম লীগে যে কাউন্সিল হয়, সেখানে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। ফলে অমুসলিমরাও এই দলে যোগ দেয়ার সুযোগ পান।

তবে পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দুইটি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার হতে শুরু করে।
ৎআওয়ামী লীগের প্রথম ভাঙন
”১৯৫২ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান শেখ মুজিবুর রহমান। পরের বছর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।”

পরবর্তীতে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তবে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মত-পার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে এই রাজনৈতিক দলটিতে ভাঙন দেখা দেয়।

”তখন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সরকারে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েকটি সামরিক চুক্তি হয়। সিয়াটো এবং সেন্টো সামরিক জোটে পাকিস্তান সদস্য ছিল।
মওলানা ভাসানী এবং দলের মধ্যে থাকা বামপন্থীরা চাপ দিচ্ছিলেন যাতে আওয়ামী লীগ মার্কিন সামরিক জোট থেকে বেরিয়ে আসে। সোহরাওয়াদীকে মার্কিন চুক্তির সমর্থক বলে মনে করা হতো।”

পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি করছিলেন মওলানা ভাসানী, কিন্তু তাতে রাজি হননি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী।

ওই বিরোধের একটা পর্যায়ে এসে টাঙ্গাইলের কাগমারিতে দলের যে সম্মেলন হয়, সেখানে মওলানা ভাসানীর প্রস্তাবটি ভোটাভুটিতে হেরে যায়। এরপর ১৮ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মওলানা ভাসানী।

সেই বছর ২৫শে জুলাই তিনি ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে অনেক নেতা তার নতুন দলে যোগ দেন, যাদের মধ্যে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইয়ার মোহাম্মদ খানও। তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। সাধারণ সম্পাদক হিসাবে থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৪ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ আবার পুনর্গঠন করা হয়।

”আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার জন্য তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু মানিক মিয়া তাতে রাজি হননি, কারণ তিনি লেখালেখি নিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামের সাবেক একজন মন্ত্রীকেও অনুরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনিও সভাপতির দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। ”

”তখন ১৯৬৪ সালের কাউন্সিল সভায় মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে পুরোপুরি সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক থেকে যান।”
কিন্তু ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণা করার পর মাওলানা তর্কবাগীশসহ অনেকেই তার বিরোধিতা করেন।”

”ওই বছর মার্চ মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মিটিংয়ে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। যারা ছয় দফার বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের অনেক নেতাই আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।”
সেই নেতৃত্বের হাত ধরেই বাংলাদেশ পরবর্তীতে স্বাধীন হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ একত্রিত হয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করে, যেখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকগণ প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর দলটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং এর বহু জ্যেষ্ঠ নেতা-কর্মী নিহত হন বা কারাবন্দি হন।
বর্তমান আওয়ামীলীগ
১৯৮১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা দলটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এখনও তিনি সেই পদে রয়েছেন।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। দলটি ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর দলটি গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের সকল ধরনের অনলাইন ও সরাসরি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এরপর ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ পুণরায় ঘোষণা করে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ওবায়দুল কাদের যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংগ্রামের উল্লেখযোগ্য পর্যায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:

ভাষা আন্দোলন ও প্রাথমিক সংগ্রাম (১৯৪৯-১৯৫৪): প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণমানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে দলটির নেতারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে দলটি প্রাদেশিক নির্বাচনে বিশাল জয় লাভ করে।

ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬): বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৬৬ সালে উত্থাপিত ‘ছয় দফা দাবি’ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে। এই দাবির পক্ষে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা ব্যাপক কারাবরণ করেন।
গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০-এর নির্বাচন (১৯৬৯-১৯৭০): ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর দলটির নেতৃত্বে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত ‘মুজিবনগর সরকার’ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর দলটি ক্ষমতার বাইরে থেকে নানা চড়াই-উতরাই ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, নেতাকর্মীদের অসীম ত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল।

Tag :
About Author Information

আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে সৌম্যর সরকারের মধ্যে

আওয়ামী লীগের জন্ম যেভাবে হয়েছিল

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

আওয়ামী লীগের জন্ম যেভাবে হয়েছিল

আপডেট টাইম : ০১:৫০:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাত দশকের বেশি সময় পার করেছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।

১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন বিকালে ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় নতুন একটি রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে সেই দলের নাম পরিবর্তন হয়ে হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

যেভাবে গঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরে ঢাকায় মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলানা আকরাম খান এবং খাজা নাজিমুদ্দিন।

সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী যে প্রোগ্রেসিভ [উদারপন্থী) নেতারা ছিলেন, তারা তখন সেখানে নিজেদের অবহেলিত মনে করছিলেন। তখন তারা মোঘলটুলিতে ১৫০ নম্বর বাড়িতে একটি কর্মী শিবির স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা চিন্তা করছিলেন। কলকাতা থেকে এসে শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সাথে যুক্ত হন।
তখন টাঙ্গাইলে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ পদত্যাগ করার কারণে শূন্য হওয়া একটি উপনির্বাচনে দুই দফায় মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হক। কিন্তু তাদের দুজনের নির্বাচনী ফলাফলই অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

তখন তারাও এসে এই মুসলিম কর্মীদের সঙ্গে মিলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা ভাবতে শুরু করেন। তারা একটি সভা ডাকেন। সেই সভা ডাকার প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান।

কিন্তু সেই সভা করার জন্য কোন অডিটোরিয়াম পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন কে এম দাস লেনের কাজী হুমায়ুন রশীদ তার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে সভা করার আহবান জানান।
সেখানেই ২৩শে জুন বিকালে আড়াইশো-তিনশো লোকের উপস্থিতিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী সেই দলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।

সেই সঙ্গে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’, যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

যারা ছিলেন নবগঠিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে

নতুন দল গঠনের পর মওলানা ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয় একটি নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করার জন্য। তিনি অন্যদের সাথে পরামর্শ করে একটি কমিটি ঘোষণা করেন।

সেই নতুন কমিটির সভাপতি হলে মওলানা ভাসানী। সহ-সভাপতি হলেন আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান, আহমেদ আলী খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আবদুস সালাম খান। সাধারণ সম্পাদক হলেন শামসুল হক।

ট্রেজারার হন ইয়ার মোহাম্মদ খান, যার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে প্রথম সভার আয়োজন হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে আটক থাকলেও তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এভাবেই প্রথম ৪০ জনের কমিটি গঠিত হয়। তবে পরবর্তীতে তাদের অনেকে আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকেননি।

দলের নামের পরিবর্তন
‘দলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি থাকায় পরবর্তীতে কেউ কেউ আপত্তি করছিলেন। এ নিয়ে দলে বেশ একটি বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যে মুসলিম শব্দটি থাকবে নাকি থাকবে না।”

তখন হিন্দু এবং মুসলিম আসনে আলাদাভাবে নির্বাচন হতো। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় একটা সমঝোতা হয়েছিল যে, এই দলটি একটি অসাম্প্রদায়িক দল হবে। ওই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায় যুক্তফ্রন্ট, যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খেলাফত পার্টি আর নেজামে ইসলামী পার্টির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিল ১৪৩টি আসন।

যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
যদিও মওলানা ভাসানী দলকে অসাম্প্রদায়িক করতে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য জোর দিচ্ছিলেন, কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চাইছিলেন যে মুসলিম শব্দটি থাকুন। কারণ তার ভয় ছিল, এটা বাদ হলে পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা কমে যাবে,”

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ আওয়ামী মুসলিম লীগে যে কাউন্সিল হয়, সেখানে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। ফলে অমুসলিমরাও এই দলে যোগ দেয়ার সুযোগ পান।

তবে পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দুইটি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার হতে শুরু করে।
ৎআওয়ামী লীগের প্রথম ভাঙন
”১৯৫২ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান শেখ মুজিবুর রহমান। পরের বছর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।”

পরবর্তীতে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তবে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মত-পার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে এই রাজনৈতিক দলটিতে ভাঙন দেখা দেয়।

”তখন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সরকারে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েকটি সামরিক চুক্তি হয়। সিয়াটো এবং সেন্টো সামরিক জোটে পাকিস্তান সদস্য ছিল।
মওলানা ভাসানী এবং দলের মধ্যে থাকা বামপন্থীরা চাপ দিচ্ছিলেন যাতে আওয়ামী লীগ মার্কিন সামরিক জোট থেকে বেরিয়ে আসে। সোহরাওয়াদীকে মার্কিন চুক্তির সমর্থক বলে মনে করা হতো।”

পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি করছিলেন মওলানা ভাসানী, কিন্তু তাতে রাজি হননি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী।

ওই বিরোধের একটা পর্যায়ে এসে টাঙ্গাইলের কাগমারিতে দলের যে সম্মেলন হয়, সেখানে মওলানা ভাসানীর প্রস্তাবটি ভোটাভুটিতে হেরে যায়। এরপর ১৮ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মওলানা ভাসানী।

সেই বছর ২৫শে জুলাই তিনি ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে অনেক নেতা তার নতুন দলে যোগ দেন, যাদের মধ্যে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইয়ার মোহাম্মদ খানও। তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। সাধারণ সম্পাদক হিসাবে থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৪ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ আবার পুনর্গঠন করা হয়।

”আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার জন্য তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু মানিক মিয়া তাতে রাজি হননি, কারণ তিনি লেখালেখি নিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামের সাবেক একজন মন্ত্রীকেও অনুরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনিও সভাপতির দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। ”

”তখন ১৯৬৪ সালের কাউন্সিল সভায় মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে পুরোপুরি সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক থেকে যান।”
কিন্তু ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণা করার পর মাওলানা তর্কবাগীশসহ অনেকেই তার বিরোধিতা করেন।”

”ওই বছর মার্চ মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মিটিংয়ে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। যারা ছয় দফার বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের অনেক নেতাই আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।”
সেই নেতৃত্বের হাত ধরেই বাংলাদেশ পরবর্তীতে স্বাধীন হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ একত্রিত হয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করে, যেখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকগণ প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর দলটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং এর বহু জ্যেষ্ঠ নেতা-কর্মী নিহত হন বা কারাবন্দি হন।
বর্তমান আওয়ামীলীগ
১৯৮১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা দলটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এখনও তিনি সেই পদে রয়েছেন।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। দলটি ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর দলটি গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের সকল ধরনের অনলাইন ও সরাসরি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এরপর ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ পুণরায় ঘোষণা করে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ওবায়দুল কাদের যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংগ্রামের উল্লেখযোগ্য পর্যায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:

ভাষা আন্দোলন ও প্রাথমিক সংগ্রাম (১৯৪৯-১৯৫৪): প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণমানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে দলটির নেতারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে দলটি প্রাদেশিক নির্বাচনে বিশাল জয় লাভ করে।

ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬): বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৬৬ সালে উত্থাপিত ‘ছয় দফা দাবি’ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে। এই দাবির পক্ষে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা ব্যাপক কারাবরণ করেন।
গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০-এর নির্বাচন (১৯৬৯-১৯৭০): ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর দলটির নেতৃত্বে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত ‘মুজিবনগর সরকার’ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর দলটি ক্ষমতার বাইরে থেকে নানা চড়াই-উতরাই ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, নেতাকর্মীদের অসীম ত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল।