১২:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়: সংগ্রাম, মানবিক যন্ত্রণার প্রতীক এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী প্রভাব

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একজন মহীয়ষী ও সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া এই নারী নেত্রী তার জীবনের প্রায় সব রকম মানবিক ও রাজনৈতিক কষ্ট ভোগ করেছেন। তার জীবনশৈলীর বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় পর্যায়ে তিনি চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।

১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া ছিলেন যুদ্ধরত সৈনিকদের স্ত্রী। সে সময় চরম উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক এবং শত্রুদের হাতে বন্দিত্বের মতো মানবিক যন্ত্রণা তিনি সহ্য করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৫ সালে গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হয়। এরপর ১৯৮১ সালে তার জীবনে অকাল বৈধব্য আসে।

তার রাজনৈতিক জীবনের ৪৪ বছরের সংগ্রামে ৩০ বছর দুই স্বৈরশাসনের নিপীড়ন এবং শেষ ১৮ বছর পরিবারহীন, নিঃসঙ্গতার মধ্যে কাটে। পরিবারিক যন্ত্রণাও কম ছিল না—এক সন্তানকে হারানোর দুঃখ, অন্য সন্তানকে পঙ্গু করে নির্বাসনে পাঠানোর যন্ত্রণা, পরিত্যক্ত কারাগারে কাটানো অসংখ্য দিন—সবই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও মানবিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তিনি যে বার্তা রেখেছেন তা স্পষ্ট—সহজ পথ এড়িয়ে, দেশের মুক্তি ও মানুষের কল্যাণের জন্য কঠিন পথ বেছে নেওয়া যায়। এতকিছুর পরও তার মুখে সর্বোচ্চ প্রকাশিত রাগ বা গালি মাত্র একবার—“বেয়াদব”—যা তার ধৈর্য, সংযম ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক।

তার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব কেবল বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। তার সরকারের সময় দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্যোগ, নারী ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রসার ঘটে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্র তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে, সরকারি ও রাজনৈতিক পর্যায়ে বিভিন্ন শোকসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ তার নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন, এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

ফিউচার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, খালেদা জিয়ার জীবন মানবিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক শিক্ষার এক অনন্য ধারা। তার সংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সহ্য ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের জন্য নিরলস লড়াই শেখাবে। এছাড়া তার জীবনের উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও মানবিকতার সংমিশ্রণকে চিহ্নিত করবে।
শেষরূপে, তার বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়; এটি জাতির জন্য গভীর শোক এবং একটি শিক্ষণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতির মান ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করবে। আল্লাহ তাঁর রুহের মাগফিরাত দান করুন এবং বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করুন আমিন।

জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
jahangirfa@yahoo.com

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে সৌম্যর সরকারের মধ্যে

আসন্ন নির্বাচনে আসছেন ৩৩০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক

বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়: সংগ্রাম, মানবিক যন্ত্রণার প্রতীক এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী প্রভাব

আপডেট টাইম : ০৯:৩৯:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একজন মহীয়ষী ও সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া এই নারী নেত্রী তার জীবনের প্রায় সব রকম মানবিক ও রাজনৈতিক কষ্ট ভোগ করেছেন। তার জীবনশৈলীর বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় পর্যায়ে তিনি চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।

১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া ছিলেন যুদ্ধরত সৈনিকদের স্ত্রী। সে সময় চরম উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক এবং শত্রুদের হাতে বন্দিত্বের মতো মানবিক যন্ত্রণা তিনি সহ্য করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৫ সালে গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হয়। এরপর ১৯৮১ সালে তার জীবনে অকাল বৈধব্য আসে।

তার রাজনৈতিক জীবনের ৪৪ বছরের সংগ্রামে ৩০ বছর দুই স্বৈরশাসনের নিপীড়ন এবং শেষ ১৮ বছর পরিবারহীন, নিঃসঙ্গতার মধ্যে কাটে। পরিবারিক যন্ত্রণাও কম ছিল না—এক সন্তানকে হারানোর দুঃখ, অন্য সন্তানকে পঙ্গু করে নির্বাসনে পাঠানোর যন্ত্রণা, পরিত্যক্ত কারাগারে কাটানো অসংখ্য দিন—সবই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও মানবিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তিনি যে বার্তা রেখেছেন তা স্পষ্ট—সহজ পথ এড়িয়ে, দেশের মুক্তি ও মানুষের কল্যাণের জন্য কঠিন পথ বেছে নেওয়া যায়। এতকিছুর পরও তার মুখে সর্বোচ্চ প্রকাশিত রাগ বা গালি মাত্র একবার—“বেয়াদব”—যা তার ধৈর্য, সংযম ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক।

তার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব কেবল বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। তার সরকারের সময় দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্যোগ, নারী ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রসার ঘটে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্র তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে, সরকারি ও রাজনৈতিক পর্যায়ে বিভিন্ন শোকসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ তার নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন, এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

ফিউচার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, খালেদা জিয়ার জীবন মানবিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক শিক্ষার এক অনন্য ধারা। তার সংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সহ্য ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের জন্য নিরলস লড়াই শেখাবে। এছাড়া তার জীবনের উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও মানবিকতার সংমিশ্রণকে চিহ্নিত করবে।
শেষরূপে, তার বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়; এটি জাতির জন্য গভীর শোক এবং একটি শিক্ষণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতির মান ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করবে। আল্লাহ তাঁর রুহের মাগফিরাত দান করুন এবং বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করুন আমিন।

জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
jahangirfa@yahoo.com