চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে আরও কার্যকর করতে এবং এর অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরকার মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের গতি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
সরকারের প্রধান অবকাঠামোগত ও শিল্প উন্নয়ন হচ্ছে:
চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন: দেশের সিংহভাগ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দরের মাধ্যমে হয়। এর সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ-এর অধীনে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (PCT) এবং বহুল প্রতীক্ষিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর (BSMSN): চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এবং ফেনীর সোনাগাজী জুড়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই শিল্প নগরী গড়ে তোলা হচ্ছে। এখানে দেশি-বিদেশি বিপুল বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প চট্টগ্রামের সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করেছে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও নাগরিক অসন্তোষ
সরকারের পক্ষ থেকে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও, বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে ধীরগতি এবং স্থানীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে:
জলাবদ্ধতা সমস্যা: চট্টগ্রামের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলো বর্ষাকালে জোয়ারের পানি এবং অতিবৃষ্টিতে নিয়মিত তলিয়ে যায়। মেগা প্রকল্প চালু থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ রয়েছে।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অভাব: চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, লাইসেন্স নবায়ন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় এবং নীতি-নির্ধারণী কার্যাবলীর জন্য এখনও ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হয়।
নাগরিক সেবার মান: রাস্তাঘাটের সংস্কার, যানজট নিরসন এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মতো শিল্প সংযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক পরিবেশকে পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব করার পথে বাধা হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে যে কাঠামোগত পদক্ষেপ প্রয়োজন:
চট্টগ্রামকে কাগজে-কলমে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও বাস্তবে এর পূর্ণ রূপায়ণে আরও সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এটি সফল হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং রাজধানী ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক চাপ অনেকটাই হ্রাস পাবে।চট্টগ্রামকে একটি কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
১. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় কার্যালয় শক্তিশালীকরণ
সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়ের উইং স্থানান্তর: বাণিজ্য, নৌপরিবহন, শিল্প এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরগুলোর প্রধান বা শক্তিশালী আঞ্চলিক উইং চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি: চট্টগ্রামের বিভাগীয় ও স্থানীয় সরকারি অফিসগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (Empowerment) বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের ছোটখাটো অনুমোদনের জন্য ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়।
প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর: রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি বড় ব্যাংক, বিমা কোম্পানি এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে সরিয়ে নেওয়া বা দ্বৈত প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
২. শক্তিশালী ‘নগর সরকার’ (City Government) গঠনসমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (সিডিএ), সিডিএ, ওয়াসা, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের তীব্র অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি ক্ষমতাশালী ‘নগর সরকার’ বা সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি।
৩. বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর আধুনিকায়নমেগা প্রকল্প দ্রুত সম্পন্নকরণ: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর, বে-টার্মিনাল এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত ও দক্ষতার সাথে শেষ করতে হবে।সহজ আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া: বন্দরের অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া আরও উন্নত করে কাস্টমস ও লজিস্টিকস সেবা সহজ করতে হবে, যাতে ব্যবসার সময় ও ব্যয় (Cost of doing business) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
৪. অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পায়নমিরসরাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর ও বিশেষ জোন: মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং প্রস্তাবিত অন্যান্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোনগুলোর (যেমন- চাইনিজ ইকোনমিক জোন) অবকাঠামো দ্রুত প্রস্তুত করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্প: কলম্বো বা অন্যান্য বৈশ্বিক গ্রিন সিটির মতো চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশে পরিবেশবান্ধব, হাই-টেক এবং টেকসই ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করা উচিত।
৫. উন্নত যোগাযোগ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
যানজট ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ: চট্টগ্রামের মূল শহরের দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘জলাবদ্ধতা’ এবং ‘যানজট’ স্থায়ীভাবে নিরসন করতে হবে।
মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দ্রুতগতির ট্রেন চালুকরণ, মহাসড়কগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্ণফুলী টানেলের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সংযোগ সড়কগুলোর উন্নয়ন প্রয়োজন।
৬. ফাইন্যান্সিয়াল ও আইটি হাব প্রতিষ্ঠা
আলাদা ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট: শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো এলাকাকে (যেমন- আগ্রাবাদ বা নতুন কোনো জোন) আন্তর্জাতিক মানের ‘ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে ওয়ান-স্টপ ব্যাংকিং, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া।
আইটি ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: চট্টগ্রামে হাই-টেক পার্ক ও সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্কের পরিধি বাড়িয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আইটি হাব তৈরি করা।
৭. আন্তর্জাতিক সেবা ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আধুনিকায়ন: শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আরও বড় ও আধুনিক করতে হবে, যাতে বিশ্বের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক শহরের সাথে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা যায়।
পর্যটন ব্র্যান্ডিং: ফয়েজ লেক, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এবং কাছাকাছি অনিন্দ্যসুন্দর পার্বত্য অঞ্চল ও কক্সবাজারের সাথে সংযোগ রেখে চট্টগ্রামকে একটি বৈশ্বিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। সরকারের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমেই চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
রিপোর্টারের নাম 










