বিশ্ববাজারের অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সামরিক জোট গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে মিত্ররা সাড়া না দেওয়ায় যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তার জেরে তেলের দাম বেড়েছে। এদিকে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি দেশেও বিরাজ করছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। ছুটির দিনেও গতকাল রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
অবশ্য শুধু দেশের পরিবহন বা যোগাযোগখাতেই সঙ্কট নয়; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাঈল-ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুদ্ধ শুরুর আগে পাঠানো প্রায় এক হাজারের মতো রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকে আছে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে। এতে বেশি বিপাকে পড়েছে ছোট উদ্যোক্তারা। রফতানি পণ্য মধ্যপথে আটকে থাকায় বায়ারদের কাছে থেকে কাঙ্খিত বিল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ঈদ সামনে রেখে কারখানা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ছোট রফতানিকারকদের। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে, ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর কলম্বো ও সিঙ্গাপুর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কনটেইনার পরিবহনে বিপত্তি তৈরি হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি হওয়া পণ্যভর্তি প্রায় ৮শ থেকে এক হাজার কনটেইনার দুই ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে আটকা পড়েছে। কখন এসব কনটেইনার গন্তব্যে যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পেটফ্ল্যাক্স ও তৈরি পোশাক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে নিয়মিত কনটেইনার আসা-যাওয়া ব্যাহত হওয়ায় কলম্বো এবং সিঙ্গাপুর পোর্টে তৈরি হচ্ছে কনটেইনার ও জাহাজ জট। এসব বন্দর থেকে বাংলাদেশি ফিডার জাহাজগুলো পণ্য আনা-নেওয়া করে।
সূত্র মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাঈল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বেড়েছে। এশিয়ার বাজারে আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম মানদ- হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৯৫ ডলার ৯৩ সেন্টে উঠেছে।
কয়েক দিন ধরে অবশ্য তেলের দাম এই সীমার মধ্যে আছে। কখনো কিছুটা কমছে, কখনো বাড়ছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। তারপর এক দিনেই তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। এরপর তা আবার ১০০ ডলার পেরিয়ে যায়।
জ্বালানি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির বিশ্লেষক সল কেভনিক বলেন, যুদ্ধ কত দিন চলবে, এ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন একেক সময় একেক রকম বার্তা দেওয়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে নজর রাখছেন। কেননা দিনকে দিন যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সোমবার জানান, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা রক্ষায় শিগগিরই বহুজাতিক জোট ঘোষণা করা হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই জোট এখনো পুরোপুরি গঠন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, কিছু দেশ এতে আগ্রহী হলেও কয়েকটি দেশ অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, কোনো কোনো দেশ খুবই উৎসাহী, আবার কোনো কোনো দেশ অতটা আগ্রহী নয়। আমি মনে করি, কেউ কেউ এতে অংশ নেবে না, অথচ তাদের আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিপুল ব্যয়ে সুরক্ষা দিয়ে আসছি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচলের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সামরিক সহায়তা চেয়েছে। ইরানের হামলার পর এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে গেছে। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ তৈরি হয়েছে।
আইএনজির পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, তেল সরবরাহে এত বেশি বিঘœ ঘটছে যে বাজারের জন্য দ্রুত কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বিমা সুরক্ষা বা নৌবাহিনীর পাহারার মতো প্রস্তাব থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়নি। কেননা বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দিতে গেলে নৌবাহিনী নিজেই হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ওমান ও ইরানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক তেল-বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে পরিবাহিত হয়েছে। সারা বিশ্বে সমুদ্রপথে যত অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়, এর প্রায় ৩১ শতাংশ এই পথে হয়। জ্বালানিবিষয়ক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালিতে যেকোনো বিঘœ বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের বাজার শিগগিরই স্বাভাবিক হবে না-এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। একই সঙ্গে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে জরুরি মজুত থেকে বাজারে আরও তেল ছাড়ার কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ইতিমধ্যে যে পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এর আগে এত পরিমাণ তেল কখনোই একসঙ্গে ছাড়া হয়নি। তা সত্ত্বেও সদস্যদেশগুলোর কাছে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জরুরি মজুত আছে। প্রয়োজন হলে মজুত থেকে আরও তেল বাজারে ছাড়া হতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিকল্প রুটে যাতায়াত করছে অনেক জাহাজ। এতে আসা-যাওয়ায় সময় বেশি লাগছে। ফলে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে জাহাজ জট তৈরি হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে জাহাজ ভিড়তে দুই-তিন দিন বাড়তি সময় লাগছে। কলম্বো বন্দরে ধারণক্ষমতার বেশি কনটেইনার জমেছে। এসব বন্দরে আটকা পড়েছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যগামী রফতানিপণ্যবাহী ৮শ থেকে এক হাজার কনটেইনার।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) হেড অব অপারেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস আজমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, সিঙ্গাপুরে এখন দুই থেকে তিনদিন বার্থিং বিলম্বিত হচ্ছে। কলম্বো বন্দরের ইয়ার্ডগুলো কনটেইনারে পরিপূর্ণ। ধারণক্ষমতার বাইরে কনটেইনার রাখা আছে কলম্বো বন্দরের প্রধান টার্মিনালে। যেখানে মেইন লাইন ভেসেল হ্যান্ডল হয়, তাতে ধারণক্ষমতার ১০৩ শতাংশ পর্যন্ত কনটেইনার জমেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 













