বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।
শেখ হাসিনার যখন জন্ম হয়, তখন ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে দেশভাগের এক উত্তাল সময়। তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র এবং তরুণ রাজনৈতিক নেতা। দেশভাগ, দাঙ্গা এবং কলকাতার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকার কারণে কন্যার জন্মের সময় তিনি টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ হাসিনার জন্মের সময়ের একটি আবেগঘন ও সুন্দর স্মৃতি পাওয়া যায়। দেশভাগের পর টুঙ্গিপাড়ায় ফিরে যখন শেখ মুজিব প্রথম তাঁর সদ্যজাত কন্যাকে দেখেন, সেই মুহূর্তটি ছিল পরম মমতার। শেখ মুজিব লিখেছেন, “হাসিনা জন্ম গ্রহণ করেছে। আমি যখন বাড়ি পৌঁছালাম, হাসিনা তখন পাঁচ-ছয় মাসের। ও আমার দিকে চেয়ে হাসল এবং হাত বাড়িয়ে দিল।” পিতার অনুপস্থিতিতে মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এবং দাদি সােরা খাতুনের স্নেহে তাঁর শৈশবের প্রথম দিনগুলো কেটেছিল।
নিজের জন্মদিনের স্মৃতিচারনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন..
“কত জন্মদিন গেছে যে দিনটিতে আব্বা জেলে। আমরা যখন জেলগেটে আব্বার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, তখন আব্বা আমাদের হাতটা ধরে আদর করতেন। ওটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় জন্মদিনের উপহার। আব্বা যখনই জেলের বাইরে থাকতেন, কোনো বিশেষ দিনে আমাদের ডেকে বলতেন—দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করাই জীবনের আসল উদ্দেশ্য, নিজের জন্য কিছু চাওয়ার নেই।”
“জন্মদিনের সকালে মা (বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব) নিজের হাতে পায়েস রেঁধে খাওয়াতেন। সকালে উঠে মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম, মা মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে দিতেন। মা বলতেন, ‘বেঁচে থাকো, মানুষের মতো মানুষ হও।’ মায়ের সেই দোয়ার চেয়ে দামী কোনো উপহার আর পৃথিবীতে হয় না।”
বড় হওয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ ও পিতার অনুপস্থিতি:
শেখ হাসিনার শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে এক অনন্য রাজনৈতিক আবহে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর তাঁদের পরিবার ঢাকায় চলে আসে। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁদের পারিবারিক জীবন কখনোই সাধারণ ছিল না।
শৈশব থেকেই শেখ হাসিনা ও তাঁর ভাইবোনদের দেখতে হয়েছে পিতার ঘন ঘন কারাবরণ। রাজনৈতিক কারণে শেখ মুজিবুর রহমান যখন মাসের পর মাস জেলে থাকতেন, তখন মা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব একা হাতে শক্ত চিত্তে সংসার আগলে রেখেছেন। এমনও সময় গেছে, যখন বাবার দেখা পাওয়ার জন্য ছোট ভাইবোনদের নিয়ে জেলগেটে অপেক্ষা করতে হতো। এই রাজনৈতিক পরিবেশ শেখ হাসিনাকে শৈশবেই ধৈর্য, ত্যাগ এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শক্ত থাকার এক নীরব শিক্ষা দিয়েছিল।
কৈশোর ও ছাত্ররাজনীতিতে পদার্পণ:
ঢাকায় আসার পর শেখ হাসিনা আজিমপুর গার্লস স্কুল ও পরে ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে (বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ) পড়াশোনা করেন। ষাটের দশকে যখন পুরো দেশ জুড়ে আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর ‘ছয় দফা’র দাবিতে উত্তাল, তখন তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হয়ে তিনি মিছিল ও আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তিনি প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
নীলকণ্ঠী রূপকের অন্তরাল- বিষাদ ও সাহসের মেলবন্ধনঃ
পুরাণের ‘নীলকণ্ঠ’ যেমন জগতের সমস্ত বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করে সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন, শেখ হাসিনার জীবনও যেন একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে এক ‘নীলকণ্ঠী’র রূপক। তাঁর জীবনজুড়ে রয়েছে স্বজন হারানোর তীব্র বিষাদ, আর সেই বিষকে হজম করে দেশের মানুষের জন্য লড়াই করার এক অদম্য শক্তি। শৈশব থেকেই যাঁর জীবন গড়ে উঠেছিল পিতার দীর্ঘ রাজনৈতিক কারাবাসের একাকীত্ব আর মায়ের অসীম ধৈর্যের ছায়ায়। যে বয়সে সাধারণ তরুণীরা রঙিন স্বপ্নে বিভোর থাকে, সেই বয়সে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি শুনেছেন একটি জাতির মুক্তির গর্জন।
রক্তাক্ত পটভূমি ও বিষাদ সিন্ধুঃ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর জীবনের চেনা পৃথিবীকে এক লহমায় ধ্বংস করে দেয়। ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে নিহত হন পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মা ফজিলাতুন্নেসা এবং আদরের ছোট ভাইয়েরা। দূর প্রবাসে থাকায় কেবল ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। এক মুহূর্তে রাজনন্দিনী থেকে তিনি পরিণত হন এক নিঃস্ব, উদ্বাস্তু ও শোকার্ত নারীতে। দীর্ঘ ছয়টি বছর প্রবাসের মাটিতে কাটাতে হয়েছে এক তীব্র হাহাকার আর শূন্যতা বুক পকেটে নিয়ে। কিন্তু এই নীলকণ্ঠী সেই ব্যক্তিগত শোকের মহাসমুদ্রকে শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন- ইতিহাসের নতুন বাঁকঃ
১৯৮১ সালের ১৭ মে। প্রকৃতির অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর লাখো মানুষের চোখের জলের মিলনমেলায় তিনি পা রাখেন স্বদেশের মাটিতে। বিমানবন্দর থেকে যে পথ ধরে তিনি এগিয়েছিলেন, সেখানে তিনি আর কেবল শেখ মুজিবের কন্যা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক শোকার্ত জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার শেষ প্রদীপ। লাখো জনতার ভালোবাসার মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর হারানো পিতার মুখ, আর শক্ত হাতে তুলে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল এবং তাঁর পিতার আজীবনের লালিত স্বপ্নের লাল-সবুজ পতাকা।
লড়াই, নেতৃত্ব ও দীর্ঘ শাসনামলঃ
স্বদেশে ফেরার পর থেকে তাঁর পথটি কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বারবার কারাবরণ এবং অন্তত ১৯ বার আত্মঘাতী হামলার (যার মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা অন্যতম) মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছু হটেননি। মৃত্যুর দুয়ার থেকে বারবার ফিরে এসে তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। পিতার ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি দেশকে নিয়ে গেছেন এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চূড়ায়। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলো তাঁরই দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের স্মারক।
বর্তমানে ভারতে অবস্থান ও দেশে ফেরার ঘোষণা :
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেন এবং তখন থেকেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দেশে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসির রায়) প্রদান করেছে।এরপরও সম্প্রতি রয়টার্স ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে, ফাঁসির রায় থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসার এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন
২৮ সেপ্টেম্বর টুঙ্গিপাড়ার সেই নিভৃত গ্রামীণ বিকেলে যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তা আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক অবিচ্ছেদ্য, প্রশংসিত ও চিরস্মরণীয় মহাকাব্য। সাফল্য ও ব্যর্থতা, বন্দনা ও সমালোচনা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের এক অনন্য ট্র্যাজিক ও লড়াকু চরিত্র হিসেবে এই ‘নীলকণ্ঠী’র নাম বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের ক্যানভাসে চিরকাল খোদাই হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 









